ইসলামের দৃষ্টিতে সমাজ ও পরিবার


“সমাজ” ও ”পরিবার” সম্ভবত মানব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। পরিবার ব্যবস্থার উপরে ভিত্তি নিয়েই গড়ে উঠেছে সমাজ ব্যবস্থার ভিত্তি। এদিক থেকে মানব জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো সমাজ ও পরিবার। ইসলামের অনেক বিষয়াবলী বর্ণিত হয়েছে এই দুই প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে।

ইসলাম ও সামাজিকতা:

ইসলাম একক সামাজিকতায় বিশ্বাস করে তবে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় বিভিন্ন সময়ে মানুষের মাঝে সৃষ্টি হয়েছে বৈষম্য। আল্লাহ তায়ালা বলেন:

হে মানবসকল! তোমরা তোমাদের পালন কর্তাকে ভয় কর যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন আর বিস্তার করেছেন তাদের দু’জন থেকে অনেক পুরুষ ও নারী…….। (সুরা নিসা-১)

উল্লেখিত আয়াত আমাদের যে ধারণা দেয় সেগুলো হলো:

১. আল্লাহ তায়ালা সমগ্র মানবজাতির প্রভু, কোন নির্দিষ্ট জাতির নয়।

২ সকল মানুষ আদম ও হাওয়া (আঃ) এর সন্তান। সুতরাং তাদের মাঝে সমতার সম্পর্ক বিরাজমান থাকা উচিত।

ইসলামে মানবভ্রাতৃত্ব:

মানবভ্রাতৃত্বের উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠে সমাজ। তাই এ ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি জেনে নেওয়া প্রয়োজন। আল্লাহ তায়ালা যখন কুর’আনে মানবজাতিকে হেদায়েতের দিকে আহব্বান জানিয়েছেন তখন তাঁর আহবানমূলক শব্দ ছিল “হে মানব সকল”। অর্থাৎ, তিনি কোন মানুষের মাঝে বৈষম্য বা জাতিগত বিভেদ সৃষ্টি না করে সকলকেই একই ভ্রাতৃত্বের মাঝে আবদ্ধ করে সবাইকে সমমর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছেন। স্বয়ং রাসুল (সাঃ) সমাজব্যবস্থা কায়েম করেছিলেন মানবভ্রাতৃত্বের উপর। হাবশী গোলাম হযরত বেলাল (রা) কে মুয়াজ্জিন হিসেবে নিয়োগদান, সালমান (রাঃ) এর পরামর্শ গ্রহণের ঘটনা প্রমাণ করে ইসলাম কোন জাতিগত প্রভেদে বিশ্বাসী নয়।

সামাজিক বন্ধনের বৈধতা ও বৈরাগ্যবাদ:

মূলত মানুষের পারস্পারিক মেলবন্ধন থেকেই সমাজের ধারণার গোড়াপত্তন। যদি সংসারবিমুখতা মানুষের স্বভাব হতো তাহলে কখনোই সমাজ গড়ে উঠতো না। বৈরাগ্যবাদ ইসলাম সমর্থন করে না বরং ইসলাম সামাজিক মেলবন্ধনে উৎসাহ প্রদান করে। এবং এই মেলবন্ধন গঠনে কিছু সীমারেখাও প্রদান করে। রাসূল (সাঃ) বলেন, “মানুষ তার বন্ধুবর্গের চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হয় সুতরাং, তোমরা বন্ধু নির্বাচনে সতর্ক হও।”

অন্যদিকে বৈরাগ্যবাদ ইসলামে নিরুৎসাহিত হয়েছে। কেননা ব্যক্তিগত নয় বরং সঙ্ঘবদ্ধ ও সামাজিক উৎকর্ষতাই ইসলামের মূল লক্ষ্য।


সামাজিক কর্তব্য ও দায়িত্ব:

মুসলমান হিসেবে ব্যক্তিগতভাবে উৎকর্ষতা সাধন করে সমাজকে উন্মত্ততার সুযোগ করে দেওয়াকে ইসলাম সমর্থন করে না। বরং ইসলাম ও পুরো সামাজিক পদ্ধতিকে চরম উৎকর্ষতার পর্যায়ে পৌঁছিয়ে দিতে চায় যাতে ইসলামের সুমহান বার্তা সবার কাছে সমভাবে পৌঁছানো যায়। তাই মুসলিম হিসেবে সমাজের প্রতি একজন মানুষের কিছু কর্তব্য রয়েছে আর সেগুলোর মাঝে প্রধানতম হলো, আমর বিল মা’রূফ ও নাহি আনিল মুনকার। আমর বিল মারুফ এর মাধ্যমে সমাজের বাহ্যিক ও আধ্যাত্নিক উন্নয়ন সাধিত হবে আর সমাজের অন্যায় অত্যাচার বিদূরিত হবে নেহী আনিল মুনকারের বাস্তবায়নের মাধ্যমে। ইসলামের সামাজিক দায়িত্বের ব্যাপারে এই দুটি বিষয়কে অনুসরণ করার মাধ্যমেই সামাজিক সমৃদ্ধি আনয়ন সম্ভব হবে।

ইসলামের দৃষ্টিতে পরিবার:

ইসলামী নির্দেশনাগুলো যেমন সামাজিক ও সংঘবদ্ধতার উপর নিপতিত তেমনি সমাজের একক হিসেবে পরিবার ও ইসলামের গুরুত্বের দাবি রাখে। বিবাহ ও রক্তসম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে যে সামাজিক বন্ধন তৈরি হয় ইসলাম সেটিকেই পরিবার বলে স্বীকৃতি দেয়। ইসলামের অনেক আইন যা পরিবারকেন্দ্রিক ঘোষিত যেমন, স্বামী স্ত্রীর অধিকার, পরিবার গঠনের মূলনীতি, সম্পদের অধিকার নীতি এসবকিছু পারিবারিক আইন যা ইসলামে ঘোষিত হয়েছে। এদিক থেকেও যে পরিবার ইসলামের নিকট গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তা প্রমাণিত হয়।

সমাজ ও পরিবারে নারীর অবস্থান:

নারী ও পুরুষের অধিকার সম্পর্কে ইসলামের ধারণা হলো এই দুই শ্রেণী পরস্পর প্রতিযোগী নয় বরং সহযোগী। এদিক থেকে নারীরা কোন অংশেই ইসলামী সমাজের নিম্নস্তরে অবস্থান করে না। বরং নারীরা সমাজে ইসলামী নির্দেশনা মোতাবেক পুরুষদের মতোই সকল অধিকার ভোগ করার অধিকার রাখেন। এমনভাবে ধর্মীয় দিক থেকেও নারী ও পুরুষ সমান অধিকারের দাবী রাখে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

যে সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং সে ঈমানদার হোক সে পুরুষ কিংবা নারী; আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং প্রতিদানে তাদেরকে তাদের উত্তম কাজের জন্য পুরস্কার দেব যা তারা করত। (সুরা আন নাহল-৯৭)

সামাজিক ক্ষেত্রেও ইসলাম নারীদের স্ত্রী, কন্যা, মাতা হিসেবে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে যার মাধ্যমে একজন নারী স্ত্রী, কন্যা ও মাতা হিসেবে বহুবিধ অধিকার ও মর্যাদা লাভ করে।

ইসলামের পারিবারিক দৃষ্টিভঙ্গি:

ইসলাম পরিবার ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাজ গঠনের নির্দেশনা দেয়। আর ইসলামের এই ধারণায় পরিবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা পরিবারে একমাত্র সামাজিক প্রতিষ্ঠান যার মাধ্যমে ইসলামের নির্দেশনা মোতাবেক বৈধ উপায়ে সন্তান উৎপাদনের মাধ্যমে সামাজিক ব্যবস্থার অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখা সম্ভব। পরিবারের কাঠামো বিভিন্ন ধরণের হতে পারে তবে পরিবার গঠনের মূলনীতি সর্বক্ষেত্রে একই আর তা হল বৈবাহিক সম্পর্ক এবং রক্ত সম্পর্কীয় সম্পর্কের ভিত্তিতে গঠিত হবে পরিবার। পরিবারের সদস্যদের পারস্পারিক অধিকার এবং তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের ব্যাপারেও আছে ইসলামের নির্দেশনা। যার মাধ্যমে পরিবারের শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব।

স্বামী স্ত্রীর অধিকার:

সমাজে যেমন নারী-পুরুষ প্রতিযোগী নয় পরিবারেও তেমনি স্বামী ও স্ত্রী একে অপরের পরিপূরক ও সহায়তাকারী (assistant)। প্রথমত স্ত্রী’র অধিকার নিয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি হলো স্ত্রীর সমগ্র ভরণ-পোষণের দায়িত্ব স্বামীর। আর ভরণপোষণের মাঝে যেসব বিষয়ে হয়েছে সেগুলো হলোঃ

১.আবাস ২. খাদ্য ৩. পোষাক। মূলত এই তিনটি বিষয় স্ত্রীর অধিকার আর স্বামীর জন্য দায়িত্ব; কোন দয়া বা করুণা নয়। পরিবারে স্ত্রীর অধিকার কেমন হবে তা বিশ্লেষণ করার জন্য একটি কুর’আনের আয়াত ও রাসূলের একটি হাদিসই যথেষ্ট। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“তারা তোমাদের জন্য পোশাকস্বরূপ আর তোমরা তাদের জন্য পোশাকস্বরূপ।”

রাসুল (সাঃ) তাঁর বিদায় হজের ভাষণে বলেছিলেন,

“যখন তুমি খাবে তখন তাকেও একই খাবার খাওয়াবে, তুমি যেমন পোশাক গ্রহণ করবে তাদেরও তেমনই (একই মানের) পোশাক দিবে। তাদের কখনো অপমান করবে না, তাদের অপবাদ দেবে না এবং তাদের থেকে দূরে সরে যাবে না….।

উল্লেখিত আয়াত ও হাদিস একজন নারীর জন্য স্ত্রী হিসেবে প্রয়োজনীয় অধিকার আদায়ের দলিল হিসেবে যথেষ্ট।

ইসলাম পারিবারিক ক্ষেত্রে পুরুষ কেউ স্বামী হিসেবে তার অধিকার কি সেটা নিশ্চিত করেছে। এর যৌক্তিকতা হল কারো প্রতি কোন কর্তব্য আরোপিত হলে সেই ব্যক্তি ঐ ব্যাপারে অধিকার লাভের দাবিদার হবে। তেমনিভাবে সাংসারিক জীবনে কেবল স্বামী তার স্ত্রীর প্রতি দায়িত্ব পালন করে যাবে না বরং তার উপর কিছু অধিকার ভোগ করবে। ইসলামের নির্দেশিত পন্থায় তাই স্ত্রীদের দায়িত্ব হলো- আনুগত্য, সম্পদের সংরক্ষণ, সতীত্বের সংরক্ষণ ইত্যাদি। আনুগত্যের সীমা কত দূর পর্যন্ত বিস্তৃত এই প্রশ্নের জবাব হলো, যতটুকু ইসলাম সমর্থন করে বৈধ বিষয়ে প্রদত্ত আদেশ স্ত্রীর জন্য অবশ্য পালনীয় হবে। তবে শরীয়াহ বিরোধী হলে পালন করা কর্তব্য নয় বরং বিরুদ্ধাচারণ করাও বৈধ। এছাড়াও স্বামীর অধিকার সবচেয়ে বেশী অগ্রাধিকার দান, স্বামীর অনুপস্থিতিতে তার সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ, স্ত্রীর নিকট হতে গৃহের দৈনন্দিন কাজকর্ম পাবার অধিকার স্বামী রাখেন। স্বামীর অধিকার সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেন,

“পুরুষেরা নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল এ জন্য যে আল্লাহ একের উপর অন্যেকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছেন এজন্য যে তারা তাদের অর্থ ব্যয় করে…….। (সুরা নিসা-৩৪)

পিতা মাতার অধিকার:

পারিবারিক ও সামাজিক দিক থেকে পিতা-মাতা সন্তানের নিকট সদ্ব্যবহার ও তাদের ন্যায্য অধিকার পাবার দাবি রাখেন। কোর’আন ও হাদীসে এ সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তয়ালা এ প্রসঙ্গে বলেন,

“তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না, পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার কর আর তাদের মধ্যে একজন বা উভয় যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে পৌঁছায় তবে তাদের “উহ” শব্দটিও বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না এবং তাদের সাথে শিষ্ঠাচারপূর্ণ কথা বল।”



রাসুলকে সবচেয়ে ভালো কাজের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন

“সময় মত নামাজ পড়া পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা জেহাদ করা।”

সর্বোপরি বলা যায় তারা সন্তানদের নিকট থেকে সদাচরণ ও আর্থিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে ভরণপোষণের দাবি রাখেন যা পালন করা সন্তানের জন্য অবশ্য কর্তব্য।

আত্মীয়স্বজনের অধিকার:

সামাজিক বিষয়াদিগুলো সাধারণত আত্মীয়-স্বজনকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়ে থাকে। এদিক থেকে মুসলমানের উপর তাদের আত্মীয়-স্বজনদের কিছু অধিকার আছে আর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই বিষয়টি অর্থনৈতিক বা ভরণপোষণ কেন্দ্রিক নয় তবে তার নিকট থেকে সদাচারণ পাওয়ার অধিকার, বিপদের সময় সাহায্য পাবার অধিকার ইত্যাদি বিষয় ইসলাম বাস্তবায়নে উৎসাহ প্রদান করে।

ইসলাম নিছক ধর্ম নয় বরং পরিপূর্ণ জীবনবিধান। অসংখ্য বিধানাবলীর মতো ইসলামে খুব গুরুত্বের সাথে বর্ণিত হয়েছে পারিবারিক ও সামাজিক বিধান। আর এসব বিধান ও নির্দেশনা বাস্তবায়নের মাধ্যমেই সুন্দর ও সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।

আপনার মতামত জানান

About Shekh Rojob

Check Also

আপনার স্ত্রী আপনার কাছে যা প্রত্যাশা করে

আপনার স্ত্রী আপনার কাছে যা প্রত্যাশা করে ড. ইয়াসির কাজী; অনুলিখনঃ মুহাম্মদ আল-বাহলুল আপনার স্ত্রী …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *