তারিক ইবনে যিয়াদ


ইসলামের গৌরবময় ইতিহাসের প্রখ্যাত সেনানায়কদের মাঝে তারিক ইবনে যিয়াদ এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। বিশ্বজয়ী বিজেতা সেনানায়কদের মধ্যে স্পেন বিজয়ী এই সেনাপতি স্বতন্ত্র স্থানের অধিকারী। তার বিজয় অভিযানের মধ্য দিয়েই তিনি শুধু একটি দেশই জয় করেননি বরং স্বতন্ত্র একটি রাষ্ট্রের জন্মদান করেছেন। ইউরোপের দক্ষিণ-পশ্চিমের আইবেরীয় উপদ্বীপে তারিক ইবনে যিয়াদের বিজয় অভিযানের মধ্য দিয়ে জন্ম হয় মধ্যযুগের মুসলিম সভ্যতার লীলাভূমি ’আন্দালুসিয়া’র। আট শতাব্দী ব্যাপী এই রাষ্ট্র অন্ধকার ইউরোপ ও বাকী বিশ্বকে সভ্যতার আলোয় আলোকিত করে রেখেছিল। জাতিগতভাবে বার্বার তারিকের জন্ম উত্তর আফ্রিকার মরক্কোতে। তার দাদা আবদুল্লাহই তাদের পরিবারের প্রথম ব্যক্তি যিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।

তারিক ইবনে যিয়াদের শৈশব ছিল আর দশজন মুসলিম শিশুর মতই। কুর’আন ও হাদীসের জ্ঞান অর্জনের মধ্য দিয়ে তার শিক্ষা অর্জনের সূচনা হয়। সামরিক জীবনের প্রতি তার আকর্ষণের কারণে অল্প বয়সেই তিনি সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। উমাইয়া শাসনের অধীন মরক্কোর গর্ভনর ও সেনানায়ক মুসা ইবনে নুসাইরের অধীনে বিভিন্ন বিজয় অভিযানে অংশ গ্রহণ করে তিনি তার সাহস ও যোগ্যতার পরিচয় প্রদান করেন। তার যোগ্যতায় মুগ্ধ হয়ে মুসা ইবনে নুসাইর তাকে ভূমধ্যসাগর তীরবর্তী শহর তাঞ্জিয়ারের শাসনকর্তা হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেন।

তৎকালীন স্পেনের শাসক ভিসগথিক রাজা রডরিক ছিলেন একজন অত্যাচারী শাসক। স্পেনের বাসিন্দারা সহ তার নিজের লোকেরাও তাকে পছন্দ করতোনা। তারা সুযোগ খুঁজছিল তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার। এ লক্ষ্যে তারা উত্তর আফ্রিকার মুসলিম শাসকদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। এই সাহায্য প্রার্থনাকারীদের মধ্যে প্রধানতম ব্যক্তি ছিলেন তাঞ্জিয়ারের নিকটবর্তী সিউটার শাসনকর্তা কাউন্ট জুলিয়ান। রাজা রডরিক কর্তৃক তার মেয়েকে অসম্মানিত করার ঘটনায় তিনি রাজা রডরিককে ক্ষমতাচ্যুত করতে ছিলেন বদ্ধপরিকর। এছাড়া স্পেনবাসী পূর্ব থেকেই মুসলমানদের সাম্যের শাসনের সাথে পরিচিত ছিল। ফলে তারা মুসলমানদেরকে স্পেনে আসার আমন্ত্রণ জানায়।

তারিক স্পেনবাসীর আহবান গ্রহণ করেন এবং মুসা ইবনে নুসাইরের কাছে স্পেনে অভিযান পরিচালনার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করেন। মুসা তারিককে অপেক্ষা করতে বলে দামিশকে খলীফা ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিকের কাছে স্পেনে অভিযানের অনুমতির আবেদন করেন। খলীফা তাকে অভিযানের অনুমতি প্রদান করেন।
খলীফার অনুমতির প্রেক্ষিতে মুসা তারিককে অভিযানের জন্য প্রস্তুতির নির্দেশ প্রদান করেন। প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তারিক একজন বার্বার সেনাপতি তারিফ ইবনে মালিকের নেতৃত্বে স্পেনে ছোট একটি গোয়েন্দা দল প্রেরণ করেন। এই দলটি ৭১০ ঈসায়ীর জুলাই, ৯১ হিজরীর রমজানে কাউন্ট জুলিয়ানের সাহায্যে স্পেনে অবতরণ করেন। তারা স্পেনকে পর্যবেক্ষণ করে স্পেন আক্রমন করার জন্য অনুকূল পরিস্থিতি থাকার বার্তা প্রদান করেন। তারিফ ইবনে মালিকের নামানুসারে স্পেনে তাদের অবতরণস্থল তারিফা নামে পরিচিত হয়।


তারিফের অভিযানে উৎসাহিত হয়ে তারিক স্পেনে অভিযান পরিচালনার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। ৭১১ ঈসায়ীর ২৭শে এপ্রিল, ৯২ হিজরীর ৫ই রজব তিনি সাত হাজার সৈনিকের একটি বাহিনী নিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে স্পেনে অবতরণ করেন। তার নামানুসারে তার অবতরণস্থল পরবর্তীতে ‘জাবালুত তারিক’ (তারিকের পাহাড়) নামে পরিচিতি লাভ করে। বর্তমানে এটি জিব্রালটার নামে পরিচিত।

জাবালুত তারিকে কিছুদিন অবস্থান করে তারিক এখানে তাদের জন্য একটি সামরিক ঘাঁটি তৈরি করেন। পরবর্তীতে তিনি কাউন্ট জুলিয়ানের পথনির্দেশনা অনুযায়ী তিনি স্পেনের অভ্যন্তরে অগ্রসর হন। তারিক ইবনে যিয়াদ যখন স্পেনের অভ্যন্তরে অগ্রসর হন, রাজা রডরিক তখন স্পেনের উত্তরে কিছু বিদ্রোহী উপজাতির সাথে সংঘাতে লিপ্ত ছিলেন। তারিকের অগ্রসর হওয়ার কথা শোনার সাথে সাথে তিনি যুদ্ধ বন্ধ করে তারিককে বাধা দিতে দক্ষিণে অগ্রসর হন।
তারিক স্পেনের তৎকালীন রাজধানী টলেডোর দিকে অগ্রসর হন। তারিককে বাধা দিতে রাজা রডরিক এক লক্ষ সৈনিকের সমাবেশ করেন। এত বিপুল পরিমাণের বাহিনীর সমাবেশের কথা জানতে পেরে তারিক মুসার কাছে সাহায্য চেয়ে পাঠান। মুসা তাকে আরো পাঁচ হাজার সৈনিকের অতিরিক্ত বাহিনী প্রেরণ করেন। এর মাধ্যমে মুসলিম বাহিনীর সৈনিক সংখ্যা দাঁড়ায় বারো হাজারে।

উভয় বাহিনী গোয়াদিলেত নদীর তীরে বর্তমান মদীনা সিদনিয়া শহরের নিকট মুখোমুখি হয়। ৭১১ ঈসায়ীর ১৮ই জুলাই, ৯২ হিজরীর ২৮শে রমজান উভয় বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। দীর্ঘ আট দিন সংঘর্ষ চলার পর মুসলিম বাহিনী বিজয়ী হয়। রাজা রডরিক যুদ্ধক্ষেত্রেই নিহত হন।
গোয়াদিলেতের যুদ্ধের পর তারিক রাজধানী টলেডোর দিকে অগ্রসর হন। পথিমধ্যে তিনি কর্ডোভা, গ্রানাডা, মালাগা সহ বিভিন্ন শহর বিজয় করেন। রাজধানী টলেডোতে প্রবেশের পর তিনি তার উদারতা ও ন্যায়বিচার দ্বারা জনগণের মন জয় করে নেন। এরপর তিনি টলেডোতে থেকে আরো উত্তরে অগ্রসর হন এবং বাস্ক উপসাগর পর্যন্ত স্পেনের বিভিন্ন অঞ্চল জয় করেন। এরপর তিনি মুসা ইবনে নুসাইরকে স্পেনে আগমনের জন্য আমন্ত্রণ এবং তাকে সাহায্য করার জন্য আবেদন জানান।



মুসা ৭১২ ঈসায়ীর জুন, ৯৩ হিজরীর রমজানে স্পেনে আগমন করেন। তিনি তারিকের দ্বারা অবিজিত স্থানসমূহ বিজয় করার মধ্য দিয়ে রাজধানী টলেডোর দিকে অগ্রসর হন। টলেডোতে উভয় সেনাপতির মধ্যে সাক্ষাত ঘটে। টলেডোতে কিছুদিন অপেক্ষার পর তারা স্পেনের বাকী অংশ বিজয়ে বেরিয়ে পড়েন। যখন তারা স্পেনের বাকী অংশ বিজয়ের জন্য ব্যাপৃত ছিলেন, তখন খলীফা ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিক তাদের স্পেনের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানানোর জন্য রাজধানী দামিশকে ডেকে পাঠান। উভয় সেনাপতি স্পেনে তাদের কাজকে গুছিয়ে নিয়ে দামিশকের দিকে যাত্রা করেন। তারা দামিশকে পৌছার পূর্বে খলীফা ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিক ইন্তেকাল করেন এবং পরবর্তী খলীফা হিসেবে তার ভাই সুলাইমান ইবনে আবদুল মালিক ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। দামিশকে পৌছে তারা খলীফা সুলাইমান ইবনে আবদুল মালিককে স্পেনের পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেন। খলীফা সুলাইমান তাদেরকে দামিশকে অবস্থান করার আদেশ প্রদান করেন। পরবর্তী বাকী জীবন তারা দামিশকেই অতিবাহিত করেন।
৭২০ ঈসায়ীতে দামিশকে আন্দালুসিয়ার জন্মদাতা মহান সেনাপতি তারিক ইবনে যিয়াদ ইন্তেকাল করেন। ইউরোপের বুকে প্রথম মুসলিম বিজয় অভিযানকারী এই সেনাপতি আজো অমর হয়ে আছেন। স্পেনে বিজয় অভিযানের মাধ্যমে আন্দালুসিয়ার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি তৎকালীন ইউরোপে সভ্যতার সূচনা করেন। রেনেঁসাস পরবর্তী ইউরোপীয় সভ্যতার জ্ঞানগত ভিত্তি মূলত আন্দালুসিয়ার মুসলিম সভ্যতার মধ্যেই নিহিত রয়েছে। সুতরাং বলা যায়, তারিক ইবনে যিয়াদের বিজয় অভিযানের মধ্য দিয়েই ইউরোপের রেনেঁসাসের প্রকৃত সূচনা ঘটে।

আপনার মতামত জানান

About Shekh Rojob

Check Also

ইমাম শামিল: ককেশাসে রুশ আগ্রাসন প্রতিরোধ সংগ্রামী নায়ক

উনবিংশ শতকের দিকে ককেশাস অঞ্চলে রুশ সাম্রাজ্যের আগ্রাসনের সূচনা হয়। মুসলিম অধ্যুষিত ককেশিয়ার অধিবাসী বিভিন্ন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *