বসনিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রনায়ককে স্মরণ বসনীয়দের

বসনিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রনায়ককে স্মরণ বসনীয়দের

 গত ১৯শে অক্টোবর, শুক্রবার বসনিয়ায় যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে বসনিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রদূত ও দেশটির প্রথম প্রেসিডেন্ট আলীয়া ইজ্জতবেগোভিচের পঞ্চদশতম মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা হয়েছে। দিবসটি  উপলক্ষে দেশটিতে বিভিন্ন প্রকার আয়োজন করা হয়।

মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দেশটির সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী, মরহুমের পরিবার ছাড়াও সাধারণ মানুষ রাজধানী  সারায়েভোর কোভাচি কবরস্থানে তার কবরে এসে শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং মাগফেরাত কামনা করে। বসনিয়ায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিকরাও তার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য এই কবরস্থানে আসেন।

বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার মন্ত্রীসভার চেয়ারম্যান ডেনিস জিভিজিদিচ এক বিবৃতিতে আলীয়া ইজ্জতবেগোভিচকে বসনিয়া রাষ্ট্র গঠনের দার্শনিক হিসেবে উল্লেখ করে বলেন,

“আলীয়া ছিলেন একজন যোদ্ধা, যিনি স্বাধীন ও সার্বভৌম বসনিয়া-হার্জেগোভিনার জন্য সংগ্রাম করেছেন।”



এছাড়া সারায়েভোতে ‘আলীয়া ইজ্জতবেগোভিচ এবং রাষ্ট্র ও আইন সম্পর্কে তার উপলব্ধি’ শীর্ষক এক কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়।

তুরস্কের ইলদ্রিম বায়েজিদ বিশ্ববিদ্যালয় এবং বসনিয়ার সরায়েভো বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে এবং তুর্কি যিয়ারত ব্যাংক ও বসনিয়ায় তুর্কি দূতাবাসের সহায়তায় এই কনফারেন্সটি অনুষ্ঠিথ হয়।

রাজনীতিবিদ, লেখক ও আইনজীবি আলীয়া ইজ্জতবেগোভিচ বসনিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রদূত। মূলত ১৯৯২-১৯৯৫ সময়ে বসনিয়ায় চলমান গৃহযুদ্ধের মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক মহলের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেন।

বসনিয়দের কাছে ‘প্রাজ্ঞ রাজা’ (Wise King) হিসেবে পরিচিত জনাব ইজ্জতবেগোভিচ ১৯৯২ সালের ১লা মার্চ যুগস্লাভিয়ার ভাঙনের পর বসনিয়ার স্বাধীনতা ঘোষনার উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

আলীয়া ইজ্জতবেগোভিচ ১৯২৫ সালের ৮ই আগস্ট বসনিয়ার একটি ছোট শহর শামাচে জন্মগ্রহণ করেন। ২০০৩ সালের ১৯শে অক্টোবর তিনি সারায়েভোতে স্বাভাবিকভাবেই মৃত্যুবরন করেন। ১৯৯২ সাল থেকে ১৯৯৬  সাল পর্র্যন্ত তিনি বসনিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০০০ সাল পর্য়ন্ত বসনিয়ার প্রেসিডেনশিয়াল কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭০ এর দশকে তিনি ইসলামী ঘোষণা (Islamic Declaration) নামে একটি বই লেখেন এবং এতে তিনি  বসনিয়ার স্বাধীনতা, জাতীয় সচেতনতা এবং ইসলামী বিশ্বাসের প্রচার সম্পর্কে আলোচনা করেন।

পশ্চিমা সংস্কৃতি ও ইসলামের মধ্যকার পারস্পারিক সম্পর্ক এই গ্রন্থে আলোচিত হয়েছে এবং এর ভিত্তিতে নতুন সভ্যতা নির্মাণের পথ এতে প্রদর্শন করা হয়েছে।

তার রচনার জন্য যুগস্লাভ কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে বিছিন্নতাবাদের অভিযোগে গ্রেফতার করে এবং ১৯৮৩ সালে আরো ১২ জন বসনীয় বুদ্ধিজীবী সহকারে তাকে চৌদ্দ বছরের কারাদন্ড প্রদান করে। কিন্তু ১৯৮৮ সালে তিনি মুক্তি লাভ করেন।

১৯৯০ সালে তিনি বসনীয়দের নিজেদের ভূমির উপর অধিকার রক্ষার্থে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং ‘পার্টি অব ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন’ (এসডিএ) নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন।

১৯৯০ সালের প্রথম বহুদলীয় সাধারণ নির্বাচনে বসনিয়ার ২৪০টি আসনের পার্লামেন্টে এসডিএ ৮৬টি আসন লাভ করে।

১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারী-মার্চে বসনিয়ার স্বাধীনতার দাবিতে এক গণভোটে ৬৪ শতাংশ লোক তাদের রায় প্রকাশ করে। ভোটদানকারীদের মধ্যে ৯৯.৪৪ শতাংশ লোক স্বাধীনতার পক্ষে মত প্রকাশ করে।

কিন্তু বসনীয় সার্বদের নেতা রাদোভান কারাদযিচ এই রায়কে মেনে নিতে অস্বীকার করেন এবং বসনীয়দের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে দেশটিতে বসনীয়দের প্রতি গণহত্যা চালান। এর প্রেক্ষিতে শুরু হয় তিনবছর ব্যাপী স্বাধীনতার প্রশ্নে বসনিয়ায় গৃহযুদ্ধ অব্যাহত থাকে।

কিন্তু যুদ্ধ বা বসনিয়দের প্রতি গণহত্যা, কোন কিছুই আলীয়াকে স্বাধীনতার প্রশ্নে আদর্শগত স্থান থেকে লক্ষ্যচ্যুৎ করতে পারেনি।

১৯৯৫ সালের নভেম্বরে ডেটন চুক্তির মাধ্যমে বসনীয় গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটে এবং বসনিয়া স্বাধীনতা অর্জন করতে সক্ষম হয়।

২০০০ সালে আলীয়া ইজ্জতবেগোভিচ প্রেসিডেন্টের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। পদত্যাগের পর তিনি নিভৃতে সারায়েভোতে তার নিজস্ব বাসভবনে বসবাস করা শুরু করেন।

আলীয়ার মৃত্যুতে বসনিয়াসহ সারাবিশ্বেই শোকের ছায়া নেমে আসে এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে তা গুরুত্বের সাথেই প্রচারিত হয়।

তার ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে সারায়েভোর কোভাচি কবরস্থানে দাফন করা হয় এবং তার কবরের ফলকে ‘আল্লাহতে আমার বিশ্বাস… যার শক্তি সকলের উপরে…. আমরা কখনোই দাস হবোনা” লিখে রাখা হয়।

বসনিয়ার প্রাজ্ঞ রাজার কিংবদন্তী আজও তার জন্মভূমি বসনিয়া এবং একইসাথে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে জীবন্ত রয়েছে।

“ইসলাম বিটুইন ইস্ট অ্যান্ড ওয়েস্ট” (Islam Between East and West) তার বিখ্যাততম গ্রন্থ, যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

আলীয়া ইজ্জতবেগোভিচ এই বইটি সম্পর্কে নিজে মন্তুব্য করেন, এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের বচন ও বোধগম্যতার ভাষায় ইসলামের অনুবাদের চেষ্টা করা হয়েছে।

দেশে ও দেশের বাইরে তিনি আজও সমানভাবে পরিচিত ও স্মরণীয়।

আপনার মতামত জানান

About Shekh Rojob

Check Also

ধর্ষণের পরীক্ষা

মন্দিরের ভেতর ৮বছর বয়সী মুসলিম মেয়েকে ধর্ষণ করলো ভারতীয় ৪পুলিশ কর্মকর্তা।

মন্দিরের ভেতর ৮বছর বয়সী মুসলিম মেয়েকে ধর্ষণ করলো ভারতীয় ৪পুলিশ কর্মকর্তা। মন্দিরের মধ্যে আসিফা নামের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *