মুসলমানদের মাঝে পারস্পারিক শান্তি প্রতিষ্ঠার বারোটি ধাপ

মুসলমানদের মাঝে পারস্পারিক শান্তি প্রতিষ্ঠার বারোটি ধাপ

চাঁদ দেখা বনাম জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাব; ফিকহী মতামতের ভিন্নতা; বহুবিধ মাযহাব, বিপুল সংখ্যক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সম্প্রদায় ইত্যাদি বিভিন্ন দিক খেকে আমাদের মুসলমানদের মধ্যে বিভক্তি জড়িয়ে আছে।

কিন্তু আমাদের যাবতীয় বিভক্তি ও ভিন্নতাকে যদি আমরা একপাশে সরিয়ে রেখে ইসলামের মৌলিক শিক্ষার দিকে দৃষ্টিপাত করি, তবে বিভিন্ন ভিন্নমত সত্ত্বেও আমরা আমাদের মাঝে একতাবদ্ধ হওয়ার অসংখ্য কারণ ও সাদৃশ্যপূর্ণ বিষয় খুঁজে নিতে পারি। ইসলামের মধ্য থেকে আমরা শুধু আমাদের পারস্পারিক ঐক্যের কারণই নয়, এই ঐক্যের প্রক্রিয়া সম্পর্কেও জ্ঞান লাভ করতে পারি।


মাঝে মাঝে আমার চিন্তা হয়, ইসলামের মধ্যকার এই ভিন্নতা থাকা কোনক্রমেই সঠিক নয় এবং এই ভিন্নতাকে দূর করতে কিছু করার জন্য আমার ইচ্ছা হয়। কিন্তু পরক্ষণেই আমার মনে হয়, সমস্যাটি আমার চিন্তার তুলনায় অধিক বৃহত্তর। অবশ্য এটি পরাজিত মানসিকতার চিন্তা-ভাবনা কারন সমস্যাটি কোন ক্রমেই আমার থেকে বড় নয়।

আমাদের নিজেদের সম্প্রদায়ের ভেতর শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের প্রত্যেকেরই ক্ষমতা রয়েছে। শান্তি প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব শুধু নেতৃত্ব পর্যায়ের সাথেই সংশ্লিষ্ট নয়। যদি আমরা তৃণমূল থেকে এই লক্ষ্যে কাজ শুরু না করি, তবে শান্তি অর্জন আমাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়বে এবং সমস্যাটি প্রকৃতপক্ষেই আমাদের জন্য বড় হয়ে পড়বে। আমাদের নেতৃত্বের কোন উদ্যোগই তখন কাজে আসবে না। মূলত শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজটির সূচনা ব্যক্তিগত পর্যায় থেকেই শুরু হয়।

পার্থক্যই শেষ কথা নয়

প্রথমেই আমাদেরকে এটি চিন্তায় রাখতে হবে, আমাদের প্রত্যেকেরই বিভিন্ন বিষয়ে পারস্পারিক মতপার্থক্য রয়েছে। নিজস্ব পরিবেশ, প্রেক্ষিত, অনুধাবন এবং অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি বিভিন্ন ভাবে ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে এবং ইসলাম সম্পর্কে তার মনের ভেতর ধারণা তৈরি করে। এরফলে বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন প্রকার মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যায়।

কিন্তু মতের পার্থক্য হলেই কি আপনি অপর একজন মুসলিমের ভালো ভাই বা বোন হতে পারেন না?

ভিন্নতার অর্থই কি সহযোগিতার সমাপ্তি?

অবশ্যই না।

শায়খ আবদুল্লাহ বিন বায়াহ বলেন,

“আমাদের মধ্যকার পার্থক্যকে আমরা আলোচনা করবো কোন প্রকার একগুয়েমি বা অশালীন ভাষার ব্যবহার থেকে বিরত থেকে উন্মুক্ত হৃদয় ও সত্য উন্মোচনের উদ্দেশ্যে, তর্কে জয়ী হওয়ার জন্য নয়।”

মুসলমানদের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি ১২টি ইসলামী মূল্যবোধ চর্চার উপদেশ দিয়েছেন।

উম্মাহর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং সকল প্রকার মতপার্থক্যের উর্দ্ধে উঠার জন্য এই মূল্যবোধগুলো আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে চর্চার জন্য তিনি উপদেশ দিয়েছেন।

এই মূল্যবোধগুলোর চর্চা খুব জটিলতর কিছু নয় বরং এর জন্য শুধু উদ্যোগ গ্রহণের ইচ্ছা থাকাটাই যথেষ্ট।

নীতি ও প্রয়োগ
১. সহযোগিতা ও সংহতি

নির্দিষ্ট একটি লক্ষ্যের জন্য একত্রে কাজ করার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে একতা সৃষ্টি হয়। আমাদের সমাজের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে, দ্বীনের প্রচারে, অসহায়কে সাহায্য করায়, শিশুদেরকে ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত করা ও শিক্ষায় সহায়তা করা প্রভৃতি কাজ আমরা একযোগে একত্রে করতে পারি।

যদি আমরা আমাদের নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত থাকি, ন্যায় ও সৎকাজে ঐক্যবদ্ধভাবে অংশগ্রহণ করি, তবে সকল প্রকার অশুভ ও অনৈক্যকে আমাদের মোকাবেলা করা সহজ হবে।

২. সুন্দর সম্পর্ক বজায় রাখা

যখনই কোন মুসলমানের সাথে আপনার সাক্ষাত হবে, তখনই তাকে সালাম দিন। এমনকি আপনি তার প্রতি মনঃক্ষুন্ন হলেও তাকে সালাম করুন। সালাম আপনাদের মধ্যকার মনঃক্ষুন্নতার কারণ ও বিতর্কের স্মৃতিকে হালকা করে দেবে। অপরদিকে তিরস্কারের সুর শুধুই অপমানের স্মৃতিকে মনের মধ্যে জোরদার করবে এবং পরস্পরের সম্পর্কের মধ্যে তিক্ততার সৃষ্টি করবে। সালামের মাধ্যমে দুইজন মুসলমান ভাইয়ের মধ্যে ভালোবাসার সম্পর্ক জোরদার হয়।

রাসূল (সা.) বলেছেন,

“তোমরা ততক্ষণ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না যতক্ষণ না তোমরা ঈমান আনছো, এবং ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমান আনতে পারবে না যতক্ষণ না একে অন্যের প্রতি ভালোবাসা পোষণ না করছো। আমি কি তোমাদের এমন কিছুর কথা বলবো না, যার অনুশীলনের মাধ্যমে তোমাদের পারস্পারিক ভালোবাসার সৃষ্টি হবে? তোমাদের মাঝে বেশি বেশি সালামের চর্চা কর।” (মুসলিম)

৩. ভ্রাতত্ববোধ ও পারস্পারিক সমঝোতা

স্মরণ করুন, যখন রাসূল (সা.) এবং তার সাহাবীরা মক্কা ছেড়ে মদীনায় হিজরত করে আসেন, তখন তারা সকলেই একে অন্যের ভাই-বোনে পরিণত হন। আমাদেরও মুসলমান হিসেবে একত্রে হিজরত করা উচিত। যদিও হিজরত এখন মদীনায় নয়, বরং আমরা আমাদের হিজরত আল্লাহর দিকে করতে পারি।

আল্লাহর দিকে হিজরতের এই যাত্রা আমাদেরকে পরস্পরের ভাই-বোনে পরিণত করবে। যদিও আমরা এক পথেই যাত্রা করছি, তথাপি পথের অভিজ্ঞতা আমাদের ব্যক্তিভেদে বিভিন্ন প্রকার হবেই এবং এই পথে বিভিন্ন জনের কুরবানী বিভিন্ন প্রকার হবে। এই সম্পর্কে আমাদের সামান্য উপলব্ধিই পারে আমাদের মধ্যকার বিশাল ব্যবধানকে দূর করতে।

৪. প্রজ্ঞা

মানুষের মাঝে বিভক্তির সৃষ্টিতে বা মানুষকে আঘাত করার হাতিয়ার হিসেবে জ্ঞানের মত উপকারী বস্তুও ব্যবহৃত হতে পারে।

জ্ঞানকে সঠিক উপায়ে কাজে লাগানোর উপায় সম্পর্কে জানাই হল প্রজ্ঞা। এ প্রসঙ্গে তারিক গনিম বলেন, “আলেম-ওলামারা উল্লেখ করেছেন, হিকমাহ’র (প্রজ্ঞা) সর্বোত্তম সংজ্ঞা হচ্ছে সকল বস্তুকে তার নির্ধারিত স্থানে ও পরিমাণে রাখা। এই সংজ্ঞা বিপুল গুরুত্ব বহন করে; যদি এটি সম্পূর্ণরূপে প্রয়োগ করা হয়, তবে কোন প্রকার চিন্তা বা কাজই বিজ্ঞতার সাথে মূর্ত ও বিমূর্ত, ইহলৌকিক ও পারলৌকিক, সহজাত ও সম্পর্কজাত ইত্যাদি পূর্ণাঙ্গ ধারণা ছাড়া কখনোই বিশ্লেষিত হতে পারেনা।”

৫. নিষ্ঠা

মানুষকে একত্রিত করতে আমরা আমাদের সামর্থ্যের মধ্যে সকল কিছুই করা স্বত্ত্বেও আমাদের চেষ্টা ব্যর্থ হতে পারে। ব্যর্থ হওয়ার অর্থ এই নয় যে, আমরা আমাদের প্রচেষ্টাকে বন্ধ করে দেব। আল্লাহ সকলের নিষ্ঠাপূর্ণ কাজেরই পুরস্কার দেন, চাই তা সফল হোক কিংবা ব্যর্থ হোক। সুতরাং শুধু আল্লাহর কাছ থেকে প্রতিদান পাওয়ার আশায় নিষ্ঠার সাথে আপনার প্রচেষ্টাকে অব্যাহত রাখুন।

৬. ন্যায়

হে ঈমানদারগণ, তোমরা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক; আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্যদান কর, তাতে তোমাদের নিজের বা পিতা-মাতার অথবা নিকটবর্তী আত্নীয়-স্বজনের যদি ক্ষতি হয় তবুও। (সূরা নিসা, আয়াত: ১৩৫)

কখনো কখনো আমাদের নিজেদের বিরুদ্ধেও সাক্ষ্য দেওয়ার প্রয়োজন হলে, যদি আমরা অপরাধ করি, তবে নিজের বিরুদ্ধেও আমাদের নিজেদের সাক্ষ্য দেওয়া কর্তব্য।

একগুঁয়েমি করা ও নিজের দোষকে স্বীকার না করার মাধ্যমে বহু পরিবার, সমাজ ও সম্প্রদায় দ্বংস হয়েছে। ন্যায়পরায়ণতা অবলম্বন ও সত্যের সাক্ষী হওয়ার মাধ্যমে আর যে ফলাফলই আসুক না কেন, আমরা আমাদের নিজেদের মধ্যে ঐক্য বজায় রাখতে পারি।

৭. দয়া

মানবতার জন্য ইসলাম রহমত বা দয়ার নিদর্শন। আল্লাহ নিজে দয়ালু। রাসূল (সা.) বলেছেন,

“আল্লাহ তার প্রতিই দয়ালু যে অন্যের প্রতি দয়ালু।” (বুখারী)

আমরা যদি অন্যকে দয়া প্রদর্শন করতে না পারি, অন্যের অনুভূতির সাথে সহানুভূতি জানাতে না পারি, আমাদের মাঝে যদি সহনশীলতার অস্তিত্ব না থাকে, তবে আল্লাহর দৃষ্টিতে আমরা সফল হতে পারিনা।

আমাদের মুসলিম ভাই-বোনদের জন্য দয়া অনুভবের শ্রেষ্ঠ উপায় হতে পারে তাদের স্থানে আমাদের নিজেদের কল্পনা করার মাধ্যমে। আপনি চিন্তা করুন, তাদের অবস্থানে থাকলে আপনি কেমন আচরণ প্রত্যাশা করতেন এবং সেই প্রত্যাশা অনুযায়ী তাদের সাথে আচরণ করুন।

৮. ধৈর্য

যদি আপনি কখনো কোন সমস্যায় জড়িয়ে পড়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, তবে আপনার ভালভাবেই জানা রয়েছে, মানুষের সাথে কোন বিষয় নিয়ে পর্যালোচনা করা চরম ধৈর্যের বিষয়। কখনো কখনো শুধু ধৈর্য ছাড়া আপনার হাতে আর কিছুই করার থাকে না। সুতরাং, উত্তম ধৈর্যশীলতার সাথে ধৈর্যধারণ করুন।

৯. সহিষ্ণুতা

ইসলামে কিছু কিছু বিষয় বা মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে কারো মধ্যেই মতপার্থক্য নেই। উদাহরণস্বরূপ, প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ আদায় করার বিষয়ে কারো মধ্যেই কোন মতপার্থক্য নেই। অপরদিকে ভ্রমণের সময় রমজানের রোজা রাখার বিষয়ে অনেকেই রোজার রাখার পক্ষে এবং অনেকে রোজা না রাখার পক্ষে মতপ্রকাশ করেন। আপনি ইচ্ছা করলে রোজা রাখতেও পারেন বা রোজা ছেড়েও দিতে পারেন।

যদি আমরা আমাদের অন্যান্য মুসলমান ভাইদের মতামত আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া পছন্দ না করি, তবে আমাদের উচিত নয় তাদের উপর অসহিষ্ণুতা প্রদর্শনের। আমাদের অনুধাবন করা উচিত, আমাদের নিজেদের ঠিক করা মানদন্ডে যদি আমরা অপরের বিচার করি, তবে প্রকৃতপক্ষে তা আমাদের অসহিষ্ণুতা ও একগুয়েমির পরিচায়ক হবে।

১০. ভালোবাসা

আমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসতে পারি, তবে কেন আমরা পরস্পরকে ভালোবাসতে পারিনা?

প্রথমত আল্লাহকে ভালোবাসুন। এই ভালোবাসার ভেতর দিয়েই আমরা পরস্পরের ভাই-বোনে পরিণত হতে পারি। এ প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে আমরা একটি বৃহৎ জাতি বা উম্মাহতে পরিণত হতে পারি।

১১. সংলাপ

অন্যের পরিপ্রেক্ষিত, অভিজ্ঞতা এবং মতামত জানার জন্য আপনার হৃদয়কে উন্মুক্ত করুন। যখন অন্যেরা দেখবে আপনি পারস্পরিক সমঝোতা ও সাদৃশ্যের সন্ধানে মুক্তভাবে তার সাথে আলাপ করছেন, প্রতিদানে তারাও আপনার সাথে একইরূপ আচরণ করবে।

১২. মধ্যপন্থা অবলম্বন

সকল ক্ষেত্রেই ইসলামের মধ্যপন্থা অবলম্বন করুন। ভারসাম্যপূর্ণ ব্যক্তিত্ব বজায় রাখুন, যে নিজে উগ্রতা প্রদর্শন করেনা বা অন্যকেও উগ্রতা প্রদর্শনের সুযোগ দেয়না।

উপরে উল্লিখিত এই বারোটি মূল্যবোধে যদি আমরা নিজেদেরকে সজ্জ্বিত করি, তবে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের সকল মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু হবে।

আমাদের নেতৃত্বের অপেক্ষা করার সামর্থ্য আমাদের নেই, যদিও তারা অনেকেই ঐক্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছেন। আমাদের নিজ হাতে এই বিষয়টি আমাদের সমাধান করা কর্তব্য। মনে রাখবেন,

আল্লাহ কোন জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যে পর্যন্ত না তারা তাদের নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। (সূরা রাদ, আয়াত: ১১)

আপনার মতামত জানান

About Shekh Rojob

Check Also

আপনার স্ত্রী আপনার কাছে যা প্রত্যাশা করে

আপনার স্ত্রী আপনার কাছে যা প্রত্যাশা করে ড. ইয়াসির কাজী; অনুলিখনঃ মুহাম্মদ আল-বাহলুল আপনার স্ত্রী …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *