মুহাম্মদ বিন কাসিম

ইসলাম আগমনের পূর্ব থেকেই ভারতের সাথে আরবদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিলো। বাণিজ্যিক প্রয়োজনে ভারতের বিভিন্ন বন্দরে আরবদের প্রায়শই আনাগোনা থাকতো। ইসলামের আবির্ভাবের পর এই আরব বণিকদের মাধ্যমে ভারতের বিভিন্ন স্থানে ইসলামের প্রচার হতে থাকে। কিন্তু সরাসরি ইসলামী শাসনের অধীনে সর্বপ্রথম যুক্ত হওয়ার গৌরব ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় সিন্ধু ও মুলতানের । ৭১২ ঈসায়ীতে এক তরুণ সেনাপতির হাত ধরে বর্তমানে পাকিস্তানের অন্তর্গত এই ভূখন্ডদ্বয় ইসলামী খেলাফতের অধীনে যুক্ত হয়। তরুণ সেই সেনাপতি হলেন মুহাম্মদ বিন কাসিম।

আনুমানিক ৬৯৫ ঈসায়ীতে বর্তমান সউদি আরবের তায়েফের সাকীফ গোত্রে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার চাচা ছিলেন তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের ত্রাস হিসেবে পরিচিত উমাইয়া গর্ভনর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ। খলীফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের শাসনামলে উমাইয়া সাম্রাজ্যকে নিষ্কন্টক করার লক্ষ্যে তিনি মুসলিম বিশ্বে নির্বিচার  গণহত্যা চালিয়েছিলেন। বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রা.) কে তিনিই হত্যা করেছিলেন। পরবর্তী খলীফা ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিকের সময় যখন নতুন করে মুসলমানরা তিন মহাদেশে বিজয় অভিযানে বেরিয়ে পড়ে, সেই বিজয় অভিযানসমূহের তদারকের ভার তার হাতেই ন্যাস্ত ছিলো।

শৈশবেই মুহাম্মদ বিন কাসিম তার পিতাকে হারান। মুহাম্মদের মাতা নিজেই তার পিতৃহীন পুত্রের শিক্ষার ভার গ্রহণ করেন। শিক্ষা সমাপান্তে মুহাম্মদ বিন কাসিম সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। পরবর্তীতে তিনি তার চাচাত বোন ও হাজ্জাজ কন্যা যুবাইদাকে বিবাহ করেন।

৭০৫ ঈসায়ীতে উমাইয়া সিংহাসনে ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিকের আরোহণের পর মুসলমানদের বিজয়  অভিযান নতুন করে শুরু হয়। একদিকে আফ্রিকা ও স্পেনে মুসা ইবনে নুসায়ের ও তারিক ইবনে যিয়াদ অপরদিকে মধ্য এশিয়ায় কুতাইবা ইবনে মুসলিমের নেতৃত্বে মুসলমানদের বিজয় অভিযান পরিচালিত হতে থাকে। ৭১১ ঈসায়ীতে তারিক ইবনে যিয়াদ জাবালুত তারিক প্রণালী (জিব্রালটার) অতিক্রম করে স্পেনে প্রবেশ করেন। স্পেনরাজ রডারিককে পরাজিত করে তিনিই প্রথম মুসলিম সেনাপতি হিসেবে ইউরোপের বুকে তার পদচিহ্ন এঁকে দেন। অন্যদিকে সেনাপতি কুতাইবা ইবনে মুসলিম মধ্য এশিয়ায় বর্তমান চীনের কাশগড় পর্যন্ত দখল করে নেন। এরই মাঝে নতুন করে ভারতীয় উপমহাদেশের সিন্ধু মুসলিম সেনানীদের তাদের শক্তির পরীক্ষার জন্য আহবান করে নেয়।

ভারতের দক্ষিণে বর্তমান শ্রীলংকায় কিছু আরব বণিকের বসবাস ছিলো। এক বাণিজ্যিক সফরে আকস্মিক  দুর্ঘটনায় তাদের অনেকে নিহত হলে নিহতদের পরিবার শ্রীলংকায় অসহায় অবস্থার সম্মুখীন হয়। তাই নিহত বণিকদের বিধবা স্ত্রী ও এতিম সন্তানদের ইসলামী খিলাফতে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয়। এই অসহায় পরিবারগুলোকে প্রেরণের সময় তাদের সাথে শ্রীলংকার রাজা মুসলিম খলীফার জন্য কিছু মূল্যবান উপহার  সামগ্রী প্রেরণ করেন। কিন্তু ভারত সীমান্ত পার হওয়ার পূর্বেই সিন্ধু রাজ্যের সীমানায় জলদস্যুদের দ্বারা এই সম্পদ লুণ্ঠিত হয় এবং অসহায় পরিবারগুলোকে বন্দী করা হয়।

সিন্ধু সীমান্তের ইসলামী সাম্রাজ্যের পূর্বাংশের গর্ভনর হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কাছে পৌছলে তিনি সিন্ধুর তৎকালীন রাজা দাহিরকে এই ঘটনার প্রতিকার এবং অসহায় পরিবারগুলোকে উদ্ধার করার জন্য চিঠি লিখেন। কিন্তু রাজা দাহির ঔদ্ধত্যভরে সেই আহবান প্রত্যাখ্যান করেন।

রাজা দাহিরের এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ ব্যবহারে ক্রুদ্ধ হয়ে হাজ্জাজ সিন্ধুর বিরুদ্ধে একটি অভিযান প্রেরণ করেন। কিন্তু হাজ্জাজের সিন্ধুতে প্রেরিত পরপর দুইট অভিযান বিপর্যস্ত হয়। তৃতীয়বার অভিযান প্রেরণের সময় হাজ্জাজ সতর্কতার আশ্রয় নেন। সিন্ধুতে অভিযান প্রেরণের সময় তিনি বাছাই করে সাহসী ও অভিজ্ঞ সৈন্যদের নিয়ে বাহিনী গঠন করেন। এই বাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তিনি বাছাই করেন তার ভ্রাতুষ্পুত্র ও জামাতা মুহাম্মদ বিন কাসিমকে। যদিও তখন তার বয়স ছিলো খুবই কম, তথাপি তিনি ছিলেন সেনাবাহিনীর একজন অভিজ্ঞ সেনানায়ক। ৭১১ ঈসায়ীতে মাত্র ষোলো বছরের মুহাম্মদ বিন কাসিমের নেতৃত্বে এই বাহিনী সিন্ধু বিজয়ের জন্য বেরিয়ে পড়ে।

মুহাম্মদ বিন কাসিম তার বাহিনীকে দুইভাগে ভাগ করে অগ্রসর হন। একভাগ মাকরান সীমান্ত দিয়ে স্থলপথে সিন্ধুতে প্রবেশ করে। অপর অংশটি জলপথে সিন্ধুর দেবল বন্দরে উপস্থিত হয়। ৮৯ হিজরীর রবিউল আউয়ালে তিনি দেবল অবরোধ করেন। শীঘ্রই তার হাতে দেবলের পতন ঘটে। দেবলের পর একে একে সিন্ধুর বিভিন্ন শহরের তার হাতে পতন ঘটে। ৭১২ ঈসায়ীতে মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধু নদী অতিক্রম করেন এবং সিন্ধুর তৎকালীন রাজধানী ব্রাক্ষ্মনাবাদের নিকট রাজা দাহিরের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হন। যুদ্ধে রাজা দাহির পরাজিত ও নিহত হন। রাজা দাহিরকে পরাজিত করার পর তিনি রাজধানী ব্রাক্ষ্মনাবাদের দিকে অগ্রসর হন এবং তা দখল করে নেন। সেখান থেকে তিনি অপহৃত শ্রীলংকা থেকে আগত মুসলিম নারী ও শিশুদের উদ্ধার করেন। ব্রাক্ষনাবাদ দখলের পর তিনি দ্রুত সিন্ধুর বাকি অংশ এবং সিন্ধুর অধীন দক্ষিণ পাঞ্জাবের মুলতান দখল করে নেন।

সিন্ধু বিজয়ের পর মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধুতে ন্যায়বিচার ও সাম্যের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। জাতপাতের নির্মমতায় বিপর্যস্ত সিন্ধুর মানুষের কাছে এটি ছিলো সম্পূর্ণ নতুনতর একটি অভিজ্ঞতা। মুহাম্মদ বিন কাসিম প্রবর্তিত সাম্য ও ন্যায়বিচারের শাসনব্যবস্থার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে সিন্ধুর জনসাধারণ দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে। এছাড়া সিন্ধুর অমুসলিম জনসাধারণের কাছেও তিনি দেবতারূপে পূজিত হতে থাকেন।

৭১৫ ঈসায়ীতে ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিক ইন্তেকাল করলে সিংহাসনে আরোহণ করেন তার ছোট ভাই  সুলাইমান ইবনে আবদুল মালিক। তিনি ছিলেন হাজ্জাজের উপর শত্রুভাবাপন্ন। কিন্তু তিনি খলীফা হওয়ার পূর্বে হাজ্জাজ ইন্তেকাল করায় হাজ্জাজের সাথে তিনি তার শত্রুতার কোনো প্রকার অংশীদারিত্ব প্রদানে ব্যর্থ হন।  ফলে তিনি হাজ্জাজের সাথে সংশ্লিষ্ট তার পরিবারের সদস্য ও শুভাকাঙ্খীদের এই শত্রুতার অংশীদারিত্ব প্রদানে বাধ্য করেন। তারই অংশ হিসেবে তিনি মুহাম্মদ বিন কাসিমকে দামিশকে ডেকে পাঠান এবং গ্রেফতার করেন। ৭১৫ ঈসায়ীতে মাত্র বিশ বছর বয়সে মুহাম্মদ বিন কাসিমকে খলীফা সুলাইমান ইবনে আবদুল মালিকের আদেশে হত্যা করা হয়।

মাত্র বিশ বছরের জীবন হলে এই সময়ের মধ্যেই মুহাম্মদ বিন কাসিম তার কর্মের দ্বারা ইসলামী সভ্যতার ইতিহাসের একজন স্মরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। তিনিই প্রথম মুসলমানদের জন্য ভারতের পথ উন্মোচন করেন। সুলাইমান ইবনে আবদুল মালিকের অযাচিত শত্রুতার শিকার না হলে তিনি হয়তো ভারতের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত মুসলমানদের বিজয় পতাকা নিয়ে যেতে সক্ষম হতেন। তথাপি ভারতে আগমনকারী প্রথম মুসলিম সেনাপতি এবং ভারতের প্রথম মুসলিম শাসক হিসেবে ভারতীয় মুসলমানদের কাছে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। প্রতিবছর ১০ই রমজান পাকিস্তানে মুহাম্মদ ইবনে কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের স্মরণে ‘ইয়াউম বাব-উল-ইসলাম’ নামে একটি উৎসব পালন করা হয়।



 

আপনার মতামত জানান

About Shekh Rojob

Check Also

ইমাম শামিল: ককেশাসে রুশ আগ্রাসন প্রতিরোধ সংগ্রামী নায়ক

উনবিংশ শতকের দিকে ককেশাস অঞ্চলে রুশ সাম্রাজ্যের আগ্রাসনের সূচনা হয়। মুসলিম অধ্যুষিত ককেশিয়ার অধিবাসী বিভিন্ন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *